পিরিয়ডের ব্যথা কমানোর ঘরোয়া উপায় ও চিকিৎসা

 

পিরিয়ডের ব্যথা কমানোর ঘরোয়া উপায় ও চিকিৎসা

পিরিয়ডের সময়ে ব্যথা হওয়ার কারণ

পিরিয়ডের সময় যদি আপনার অসহ্য রকম পেট ব্যাথা বিশেষ করে তলপেটে, পিঠের নিচের দিকে হালকা ব্যাথা, পায়ের নিচের দিকে ব্যাথা হয়ে থাকে তবে এই পোস্ট টি আপনার জন্য। 

উপরের যে উপসর্গগুলোর কথা বললাম, এই উপসর্গে ভোগে না এমন মেয়ে আমাদের আশে পাশে খুব কম আছে। এই ধরনের ব্যাথাকে আমরা সবসময় নর্মাল মনে করে থাকি। বা আমাদের মা,দাদী নানীরা বলে থাকেন এমন এই সময়ে হয়ে থাকে। তবে আসলেই কি তাই?? আজ আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো। 

পিরিয়ডের সময়ে এই ধরনের উপসর্গকে বলা হয় ডিসমেনোরিয়া। ডিসমেনোরিয়া পিরিয়ড রিলেটেড ডিজঅর্ডার গুলোর একটি। 

ডিসমেনোরিয়া মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকেঃ

১) প্রাইমারি ডিসমেনোরিয়া 

২) সেকেন্ডারি ডিসমেনোরিয়া 

প্রাইমারি ডিসমেনোরিয়া: প্রাইমারি ডিসমেনোরিয়া মূলত পিরিয়ড যখন শুরু হয় তখন থেকে শুরু করে পিরিয়ড যতদিন চলে ততদিনই হয়ে থাকে। প্রত্যেক বার যখন পিরিয়ড হয় তখনই এই ধরনের ব্যাথা অনুভব হবে। এটা স্বাভাবিক। যে কারো ই প্রাইমারি ডিসমেনোরিয়া হতে পারে। এই ব্যাথা পিরিয়ড শুরু হবার ২/৩ দিন আগে থেকে শুরু করে পিরিয়ড এর ২/৩ দিন পর্যন্ত থাকে। তবে এই ব্যাথার তীব্রতা তুলনামূলক ভাবে কম হয়। 

সেকেন্ডারি ডিসমেনোরিয়া: পিরিয়ডের সময়ের তীব্র ব্যাথা যদি কিছু নির্দিষ্ট মেডিকেল কন্ডিশন এর জন্য হলে তখন সেটাকে সেকেন্ডারি ডিসমেনোরিয়া বলা হয়। এই মেডিকেল কন্ডিশন গুলির মধ্যে সব থেকে কমন যেটা সেটা হচ্ছে- 

√পিসিওএস বা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম 

এছাড়াও- 

√ পেলভিক ইনফ্লামেটরি ডিজিজ 

√ইউটেরাইন ফাইব্রয়েডস (জরায়ুতে ফাইব্রয়েডস থাকা)

√অস্বাভাবিক প্রেগন্যান্সি( মিসক্যারেজ/ একটোপিক প্রেগন্যান্সি) 

√ এন্ডোমেট্রিওসিস বা এডেনোমায়োসিস হলেও সেকেন্ডারি ডিসমেনোরিয়া হয়ে থাকে। 

পিরিয়ডের সময় ব্যাথা ছাড়াও ডিসমেনোরিয়ার আরও কিছু উপসর্গ রয়েছে যেমন- 

১) মাথা ঘুরানো 

২)বমি বমি ভাব 

৩)ডায়রিয়া 

৪)দূর্বল লাগা 

৫) অনেক ক্ষেত্রে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া 

৬)মাথা ব্যাথা 

অনেক ক্ষেত্রে এই সব সমস্যাগুলোকে আমার পিরিয়ডের সময় নর্মাল বলে ধরে নেই। তবে যদি পর পর কয়েকমাস পিরিয়ডের সময় ব্যাথা হবার সাথে সাথে আপনার এই সমস্যাগুলো দেখা যায় তবে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা উচিৎ। 

এবার আসা যাক কিভাবে শনাক্ত করবেন আপনার কি প্রাইমারি ডিসমেনোরিয়া নাকি সেকেন্ডারি ডিসমেনোরিয়া?  

পেটে অসহনীয় ব্যাথা হবার সাথে সাথে

-যদি আপনার হেভি ব্লিডিং হয়।  

- ক্লটেড ব্লাড আসে, অর্থাৎ পিরিয়ডের ব্লাড যদি জমাট বাধা অবস্থায় আসে। 

-যদি কালার অনেক কালচে বা ফ্যাকাসে থাকে 

- পিরিয়ডের ব্লাড একদমই কম আসা বা স্পটিং হওয়া 

আর সাথে ডিসমেনোরিয়ার অন্যান্য সিম্পটমস থাকা।

এইযে ভীষণ রকম ব্যাথা, এত সমস্যা এটা কি সলভ করা সম্ভব??  

হ্যা সম্ভব।  প্রাইমারি এবং সেকেন্ডারি ডিসমেনোরিয়া দুটোই সলভ করা সম্ভব।  

গর্ভবতী মায়েদের সুষম খাবার তালিকা

কিভাবে আপনার তীব্র পিরিয়ডের ব্যাথা কমাবেন!! 

প্রাইমারি ডিসমেনোরিয়া বা রেগুলার পিরিয়ডের ব্যাথা যেহেতু কোন মেডিক্যাল কন্ডিশনের জন্য হয়না তাই এই ব্যাথার আসলে কোন পার্মানেন্ট সলিউশন নেই। যতদিন আপনার পিরিয়ড চলবে এই ব্যাথা থাকবে কম/বেশি।  তবে হ্যা বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই ব্যাথার তীব্রতা কমতে থাকে। 

প্রাইমারি ডিসমেনোরিয়া মূলত দুইটা উপায়ে ট্রীটমেন্ট করা যায়ঃ

১) ফার্মাকোলজিকাল ট্রীটমেন্ট ( ওষুধ, হরমোনাল থেরাপি) 

২) নন ফার্মাকোলজিকাল ট্রীটমেন্ট বা প্রাকৃতিক উপায়ে ব্যাথার উপশম করা। 

আমরা এই পোস্টে নন ফার্মাকোলজিকাল ট্রীটমেন্ট বা প্রাকৃতিক উপায়ে কিভাবে ব্যাথা উপশম করা যাবে সেই উপায় নিয়ে কথা বলব- 

১)  একটি হিটিং প্যাড বা গরম পানির বোতল দিয়ে আপনার পিঠে বা তলপেটে শেক দিতে পারেন। 

২) চা, কফি বা ক্যাফেইন জাতীয় খাবার গুলি এভয়েড করতে হবে পুরোপুরি।  অনেকের পিরিয়ডের সময় মাথাব্যথা হলে চা বা কফি খাওয়ার অভ্যাস থাকে। এটা বাদ দেয়া জরুরি। 

৩)যদি সিগারেট বা ড্রিংক করার অভ্যাস থাকে সেটা এভয়েড করতে হবে। 

৪) পিঠে এবং পেটে হালকা করে মাসাজ করা। 

৫) হট শাওয়ার নেয়া বা গরম পানি দিয়ে গোসল করা। 

৬) চিনি বা মিষ্টি একদমই এভয়েড করা। অনেক আপুদের চকলেট বা মিষ্টির ক্রেভিং হয়। চকলেট বা মিষ্টি পিরিয়ডের পেইন বাড়াতে পারে 

৭) বিবাহিত দের জন্য রেগুলার সেক্স মেন্সট্রুয়াল পেইন কমাতে হেল্প করে। 

কিছু এক্সারসাইজ আছে যেটা পিরিয়ড ক্রাম্পস কমাতে সাহায্য করে বিশেষ করেকেগেল এক্সারসাইজ এবং ইয়োগা। এগুলো ট্রাই করতে পারেন। 

কিছু হার্বস এবং সাপ্লিমেন্টস নিয়মিত নিলে আপনার পিরিয়ড ক্রাম্পস অনেক টাই কমে যাবেঃ

১) ওমেগা ৩ 

২) জিংক 

৩)ম্যাগনেসিয়াম 

৪)ইভিনিং প্রিমরোজ অয়েল 

৫)পেপারমিন্ট 

সাপ্লিমেন্ট এর ডোজিং আপনার বয়স,উচ্চতা, ওজনের উপর নির্ভর করে দেয়া হয়। 

হার্বসের মধ্যে রয়েছে- 

১) আদা- আদা শরীরের ইনফ্লামেশন কমায়। তাই পিরিয়ড পেইনের জন্য আদা খুব ভালো কাজে দেয়। পিরিয়ড এর দিন গুলিতে আদা দিয়ে চা(চা পাতা ছাড়া) বা ২ গ্রাম আদার গুড়া পানিতে মিক্স করে খেতে পারেন।

২) ক্যামোমাইল চা- ক্যামোমাইল চা তে এন্টি ইনফ্লামেটরী গুনাগুন আছে সাথে আপনার শরীর কে রিল্যাক্স করতে হেল্প করে। তাই ক্যামোমাইল চা রেগুলার সেবনে পিরিয়ড ক্রাম্পস কম হতে পারে। 

৩)দারুচিনি - গবেষণায় দেখা গেছে দারুচিনির চা মেন্সট্রুয়াল ক্রাম্পস কমাতে অনেক কার্যকরী।  

৪)পেপারমিন্ট চা- পিরিয়ড ক্রাম্পস কমাতে পেপারমিন্ট অনেক কার্যকর।  পিরিয়ডের দিন গুলিতে পেপারমিন্ট চা খেতে পারেন। 

৫) হলুদ গোলমরিচের চা- হলুদ এবং গোল মরিচ এর এন্টিইনফ্লামেটরি বৈশিষ্ট্যর কারনে এরা পিরিয়ডের পেইন কমাতে কার্যকর। রেগুলার হলুদ চা খেলে অনিয়মিত পিরিয়ডের সমস্যা সহ পিরিয়ড ক্রাম্পস কমে যায়। 

৬) মৌরি এবং যষ্ঠিমধু- এই দুটি হার্বস ও পিরিয়ড ক্রাম্পস কমাতে সাহায্য করে। তাই মাঝে মধ্যে রেগুলার ডায়েটে এই চা এবং পিরিয়ডের সময়ে এই চা খেলে আপনার মেন্সট্রুয়াল পেইন এর অনেক উন্নতি লক্ষ্য করতে পারবেন। 

এবার আসা যাক সেকেন্ডারি ডিসমেনোরিয়ার জন্য কি করবেনঃ

সেকেন্ডারি ডিসমেনোরিয়ার পেইন কমাতেও উপরের পদক্ষেপ গুলি খুব ভালো কাজে দেয়। তবে হ্যা যখন আপনার এক্সট্রিম পিরিয়ডের পেইন হবে তখন সবার প্রথমে কিছু টেস্ট করে দেখা উচিত কোন সমস্যা আছে কিনা। যদি এই টেস্ট গুলোতে আপনার কোন ধরনের সমস্যা দেখা যায় যেমন - পিসিওএস, এন্ডোমেট্রিওসিস, ফাইব্রয়েডস, হরমোনাল ইমব্যালেন্স তবে উপরের রিমেডি গুলো নেয়ার আগে অবশ্যই আপনাকে এই সমস্যা গুলির সমাধান করতে হবে। কারন ৭০/৮০ ভাগ ক্ষেত্রে এই সমস্যাগুলি সমাধান হলে পিরিয়ড ক্রাম্পস অনেক অংশে কমে যায়। 

উপরের সমস্যাগুলোর কোন একটা থাকলে আপনার একজন ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিষ্ট এর সাথে যোগাযোগ করা জরুরি।  

সুমাইয়া শিলা 

চাইল্ড এন্ড রিপ্রোডাক্টিভ নিউট্রিশন কনসালট্যান্ট 

বিএস, পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট, 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম